মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে বিশ্বজুড়ে বন্ড মার্কেটে বড় ধস

সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারী

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও এর ফলে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে বন্ড মার্কেটে বড় ধরনের ধস নেমেছে।

এ পরিস্থিতির জেরে বিভিন্ন বৃহৎ অর্থনীতির দেশে সুদহার কমানোর যে প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছিল, তা এখন ম্লান হয়ে আসছে। গত কয়েক বছরের প্রেক্ষাপটে বন্ড মার্কেটের জন্য এটি অন্যতম বড় দরপতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের পেনশন ফান্ড সংকটের পর ব্রিটিশ গিল্ট (সরকারি বন্ড) গত সপ্তাহে সবচেয়ে খারাপ সময় পার করেছে। ফলে ১০ বছর মেয়াদি ব্রিটিশ বন্ডের ইল্ড শূন্য দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইল্ড শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়েছে, যা গত বছরের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। স্বল্পমেয়াদি বন্ডের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়েছে মারাত্মক; জার্মানির দুই বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৩১ শতাংশ হয়েছে, যা ২০২৩ সালের পর সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সর্বোচ্চ উল্লম্ফন।

সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে স্বল্পমেয়াদি বন্ডের বাজারে। জার্মানির দুই বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৩১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৩ সালের পর যেকোনো সপ্তাহের তুলনায় সর্বোচ্চ উল্লম্ফন।

মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের পর জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সুদহারের এ তীব্র পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় অঞ্চলটি থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারের সুদহারের ওপর।

জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাকে আরো উসকে দিয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার কমাতে পারার প্রত্যাশাও ক্ষীণ হয়ে আসছে।

সোয়াপ চুক্তির তথ্যানুযায়ী, বাজার পর্যবেক্ষকরা এখন আর সুদহার কমার সম্ভাবনা দেখছে না; বরং ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) চলতি বছর উল্টো ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদহার বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ এর আগে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল ব্যাংকগুলো সুদহার আরো কমিয়ে আনবে।

ফিডেলিটি ইন্টারন্যাশনালের ফান্ড ম্যানেজার মাইক রিডেল বলেন, ‘পরিস্থিতি এখনো আতঙ্কজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে বিনিয়োগকারীরা নিকট ভবিষ্যতে সুদহারের গতিপথ নিয়ে যে অতি-আশাবাদী অবস্থানে ছিলেন, মূলত তা থেকে তারা সরে আসছেন।’

সার্বভৌম ও করপোরেট ঋণের বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্লুমবার্গ গ্লোবাল অ্যাগ্রিগেট বন্ড ইনডেক্স ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর থেকে এ সপ্তাহের মতো এমন দরপতনের মুখে আর পড়েনি।

জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা, যা বন্ডের ইল্ড বাড়িয়ে দিয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে অপরিশোধিত তেল (ব্রেন্ট ক্রুড) ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলারে থাকলেও তা বেড়ে এখন ৯২ ডলারে পৌঁছেছে, পাশাপাশি ইউরোপে গ্যাসের দামও আকাশচুম্বী।

সংঘাত শুরুর আগে আর্থিক বাজারের ধারণা ছিল, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড চলতি বছর বর্তমান ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ নীতি সুদহার দুই দফায় কমাবে। প্রতিবার ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে কমানোর সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় এখন বাজারের প্রত্যাশা কমে গেছে। সুদহার কমানো মাত্র একবার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় অন্য বড় বাজারগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানের তথ্যে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে সেখানে ৯২ হাজার চাকরি কমেছে। এ পরিসংখ্যানের পর বিনিয়োগকারীরা ২০২৬ সালে ফেডারেল রিজার্ভের কাছ থেকে দুই দফায় ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে সুদহার কমানোর সম্ভাবনা দেখছেন।

আরও